বিশ্বব্যাপী করপোরেট নির্বাহীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে

ঝুঁকি মোকাবেলায় বছরে প্রায় ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়

বিশ্বব্যাপী করপোরেট খাতের নির্বাহীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে।

বিশ্বব্যাপী করপোরেট খাতের নির্বাহীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। সহিংসতার ঝুঁকির পাশাপাশি তাদের লক্ষ্য করে সাইবার হামলার আশঙ্কাও এখন বাড়ছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নির্বাহীদের মধ্যে নিরাপত্তা শঙ্কা এখন সবচেয়ে বেশি। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রশমনে তাদের ব্যয়ও এখন ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

ফরচুন ৫০০ তালিকার ৪০০টিরও বেশি কোম্পানির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে অ্যালায়েড ইউনির্ভাসাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের শতাধিক দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী কোম্পানিটির অন্যতম সাবসিডিয়ারি হলো ব্রিটিশ নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান জিফোরএস। বর্তমানে অ্যালায়েড ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক আয় প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার।

সম্প্রতি কোম্পানিটির পক্ষ থেকে ৩১টি দেশের মাঝারি ও বড় কোম্পানির ২ হাজার ৩৫২ জন নিরাপত্তাপ্রধানকে নিয়ে একটি জরিপ চালানো হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বার্ষিক আয় ২৫ ট্রিলিয়ন বা ২৫ লাখ কোটি ডলারের বেশি। এছাড়া ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ পরিচালনা করছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এমন ২০০টি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানও এ জরিপে অংশ নেয়।

জরিপে অংশ নেয়া বিভিন্ন খাতের নিরাপত্তাপ্রধানদের মধ্যে ৪২ শতাংশ জানিয়েছেন, করপোরেট নির্বাহীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হুমকিতে আছে মার্কিন প্রযুক্তি খাত, যেখানে ঝুঁকির হার ৬৬ শতাংশ।

জরিপে মার্কিন বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দুই-তৃতীয়াংশ নিরাপত্তাপ্রধান বলেছেন, গত দুই বছরে এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি বেড়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানকে শুধু শীর্ষ কর্মকর্তা নয়, তাদের পরিবারের নিরাপত্তার দিকেও নজর রাখতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে গত বছর বিশ্বব্যাপী নির্বাহীদের নিরাপত্তায় ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন নিরাপত্তা পরিষেবাদাতা অ্যালায়েড ইউনিভার্সাল।

নিউইয়র্ক মিউটাউন হোটেলের সামনে গত বছরের ডিসেম্বরে ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের সিইও ব্রায়ান থম্পসনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার পর থেকেই বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি আলোচনায় আসতে শুরু করে।

এ বিষয়ে অ্যালায়েড ইউনিভার্সালের প্রধান নির্বাহী স্টিভ জোন্স বলেন, ‘ব্রায়ান থম্পসন হত্যাকাণ্ডের পর থেকে সুরক্ষা পাওয়া নির্বাহীদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই (জানুয়ারি-জুন) আমরা এত বেশি ঝুঁকি মূল্যায়ন করেছি, যা এর আগে কোনো পূর্ণ অর্থবছরেও কখনো করিনি।’

কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের নিরাপত্তার ঝুঁকির বিষয়টি এখন শুধু সহিংস হামলার মধ্যে আটকে নেই বলে মনে করছেন নিরাপত্তাপ্রধানরা। বরং বিষয়টি এখন বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণাও নির্বাহীদের ঝুঁকিতে ফেলছে।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭৫ শতাংশের দাবি, কর্মীদের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে এমন প্রচারণার শিকার হয়েছে তাদের কোম্পানি। ৪২ শতাংশের মতে, হুমকি সৃষ্টিকারীদের অন্তত অর্ধেক এ ধরনের প্রচারণা দিয়ে প্রভাবিত।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ মনে করছেন, এ ধরনের কৌশল এখন সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর নির্বাহীদের পাশাপাশি স্থাপনার জন্যও নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করছে।

জরিপে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ৯৭ শতাংশের অভিমত হলো কোম্পানিগুলোর নির্বাহীদের নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করা জরুরি। প্রতি ১০ বিনিয়োগকারীর মধ্যে সাতজন বলেছেন, বিনিয়োগকৃত কোম্পানির মোট বাজারমূল্যের ৩০ শতাংশ বা তার বেশিতে অবদান রাখছেন নির্বাহীরা।

স্টিভ জোন্স বলেন, ‘আজকের বিভক্ত বিশ্বে যেকোনো ভুল তথ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে কোম্পানি ও শীর্ষ নেতৃত্বের ঝুঁকি এখন বাড়ছে। একজন সিইও হিসেবে এটি আমাকে ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে ভাবায়। আমাদের গ্রাহকরাও এখন তাদের কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলো প্রায়ই এ ধরনের আক্রমণের টার্গেট হয়। বিশেষ করে যেসব নির্বাহী গাজা যুদ্ধের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়ে মন্তব্য করেন তারা বেশি ঝুঁকিতে পড়েন।’

প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বব্যাপী কোম্পানিগুলো এখন নির্বাহী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ঝুঁকি মূল্যায়নে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে অনলাইন হুমকি ও ভ্রমণকালীন অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে নিরাপত্তা বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি নির্বাহীদের আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ও পরিবারের জন্যও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্ব বেড়েছে।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে। গত মাসে বার্তা সংস্থাটিকে বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি জানিয়েছে, কর্মী ও অবকাঠামোর ওপর নজরদারি বাড়াতে ক্যামেরা ও বায়োমেট্রিক অ্যাকসেস ব্যবস্থার উন্নয়ন করছে তারা।

২৬ শতাংশ নিরাপত্তাপ্রধান বলেছেন, গত বছর নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঝুঁকির কারণে তাদের কোম্পানির আয় কমেছে। গড়ে প্রতিটি কোম্পানি কমপক্ষে ৯০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। সম্মিলিতভাবে এর মোট পরিমাণ প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার।

বিনিয়োগকারীরা বলেছেন, নিরাপত্তা হুমকির কারণে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত একটি কোম্পানির বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। ২০২৩ সালের তুলনায় এ হার বেড়েছে ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট।

জিফোরএসের নির্বাহী চেয়ারম্যান অ্যাশলি আলমানজা বলেন, ‘নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রভাব শুধু স্বল্পমেয়াদি আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানির সুনাম ও শেয়ারহোল্ডারদের আস্থায়ও বড় ধাক্কা দেয়। তাই এখন ব্যবসায়িক নেতারা নিরাপত্তাকে করপোরেট গভর্ন্যান্স ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অন্যতম কৌশল হিসেবে বিবেচনা করছেন।’

ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে কোম্পানিগুলো আগামী ১২ মাসে এ বাবদ বাজেট বাড়াবে বলে জানিয়েছেন ৬৬ শতাংশ নিরাপত্তাপ্রধান। এ সময় শীর্ষ অগ্রাধিকারে থাকবে নতুন প্রযুক্তি ও অবকাঠামো, কর্মীদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ। ৮০ শতাংশ নিরাপত্তাপ্রধান জানিয়েছেন, তাদের কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীরা সাইবার নিরাপত্তাকে শারীরিক নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ৯২ শতাংশ বিনিয়োগকারী মনে করেন, শারীরিক নিরাপত্তার কৌশলগত গুরুত্ব আরো বাড়ানো উচিত। তাদের মতে, কোম্পানিকে প্রতারণা ও তথ্য ফাঁস ঠেকাতে বেশি প্রস্তুত হতে হবে।

আরও